ENবাং

কৃষি আজ এক জটিল সন্ধিক্ষণে। একদিকে বাড়ছে জনসংখ্যা, খাদ্যের চাহিদা ও জলবায়ু পরিবর্তনের চাপ; অন্যদিকে কৃষিজমি কমছে, মাটির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে এবং পরিবেশ দূষণ ক্রমশ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় আমাদের প্রশ্ন একটাই-আমরা কি একই পদ্ধতিতে সার ব্যবহার করে ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারব?

প্রচলিত সারের ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি মৌলিক সমস্যা রয়েছে: আমরা যে সার বা পুষ্টি মাটিতে প্রয়োগ করি, তার বড় অংশই গাছ ব্যবহার করতে পারে না। নাইট্রোজেন বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যায় বা গ্যাস আকারে উড়ে যায়। আবার অন্যদিকে ফসফরাস মাটিতে স্থায়ীভাবে আবদ্ধ হয়ে পড়ে, আর অতিরিক্ত প্রয়োগ পরিবেশে সৃষ্টি করে দূষণ। ফলাফল, কৃষকের বাড়তি ব্যয়, মাটির অবক্ষয়, নদী ও জলাশয়ে ইউট্রোফিকেশন।

এই প্রেক্ষাপটে “ন্যানোফার্টিলাইজার” নামের নতুন প্রযুক্তি নিয়ে বিশ্বব্যাপী গবেষণা ও আলোচনা বাড়ছে। ন্যানোমাত্রিক কণা যাদের আকার ১ থেকে ১০০ ন্যানোমিটার, বিশেষ ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের কারণে পুষ্টি সরবরাহকে আরও নিয়ন্ত্রিত ও কার্যকর করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই ন্যানোকণা ধীরে ধীরে পুষ্টি উপাদান Release করতে সক্ষম, উদ্ভিদের মূলাঞ্চলে অধিক সময় ধরে অবস্থান করতে পারে, এমনকি কোষপ্রাচীরের ক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে সরাসরি পুষ্টি সরবরাহে সহায়তা করতে পারে।

ন্যানোফার্টিলাইজারের বিভিন্ন রূপ ইতোমধ্যে আবিস্কৃত হয়েছে যেমন- ন্যানো-ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্ট, ন্যানো-মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট, স্লো/কন্ট্রোলড রিলিজ, ন্যানো-কম্পোজিট ও ন্যানো-এনহ্যান্সড ফর্মুলেশন। কিছু ক্ষেত্রে ধান ও গমে নাইট্রোজেন ব্যবহার দক্ষতা বৃদ্ধি, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ঘাটতি পূরণ এবং ফলন বৃদ্ধির ইতিবাচক ফলাফলও পাওয়া গেছে।

কিন্তু প্রযুক্তির আলো যত উজ্জ্বল, তার ছায়াও তত গভীর।

ন্যানোম্যাটেরিয়ালের বিশেষ সক্রিয়তা শুধু উদ্ভিদকেই প্রভাবিত করে না-এটি মাটির অণুজীব, কেঁচো, এমনকি খাদ্যশৃঙ্খলেও প্রভাব ফেলতে পারে। উচ্চ মাত্রায় প্রয়োগে কিছু ন্যানোকণা মাইক্রোবিয়াল বৈচিত্র্য হ্রাস, এনজাইম কার্যকলাপে পরিবর্তন কিংবা উদ্ভিদে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস সৃষ্টি করতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এর দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

তাহলে আমরা কোন পথে হাঁটব?

প্রযুক্তিকে অস্বীকার করা সমাধান নয়। আবার অন্ধভাবে গ্রহণ করাও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত হতে পারে না। ন্যানোফার্টিলাইজার আমাদের সামনে এক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে-কম ইনপুটে বেশি ফলন, উন্নত পুষ্টি দক্ষতা, ও পরিবেশ দূষণ হ্রাস। কিন্তু এই সম্ভাবনাকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে হলে প্রয়োজন-

বাংলাদেশের মতো সার নির্ভর কৃষি ব্যবস্থায় এই প্রযুক্তি সঠিকভাবে প্রয়োগ করা গেলে খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা জোরদার হতে পারে। বিশেষত লবণাক্ত, অনুর্বর বা মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট-ঘাটতিযুক্ত জমিতে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি কখনো একা সমাধান নয়; এটি কেবল একটি হাতিয়ার। সঠিক ব্যবস্থাপনা ছাড়া সেই হাতিয়ারই বিপরীত ফল বয়ে আনতে পারে।

বিজ্ঞান আমাদের সম্ভাবনার দিগন্ত দেখায়, কিন্তু দায়িত্বশীলতা আমাদের পথ ঠিক করে দেয়।

ন্যানোফার্টিলাইজার কি কৃষির ভবিষ্যৎ? হয়তো।

কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ হতে হবে তথ্যভিত্তিক, পরিবেশ-সচেতন এবং মানবকল্যাণমুখী।

এখন সিদ্ধান্ত আমাদের-আমরা কি বিজ্ঞানকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে প্রস্তুত?

লেখক: ড.রিপন সিকদার,
ডেপুটি প্রোগ্রাম ডিরেক্টর (সীড), পার্টনার, বিএডিসি, ঢাকাই

মেইল:
sikderripon@gmail.com
ripon.dd@badc.gov.bd


এই লেখাটি মূলত লেখক কৃতৃক Biggani.org-এ প্রকাশিত। আপনি https://biggani.org-তেও পড়তে পারেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *